Published in: Prothom Alo
Date: 18 Dec 2020
করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে সম্প্রতি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি প্যানেল আলোচনার আয়োজন করেছিল উত্তর আমেরিকা শাখা শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ অ্যালামনাই। মূলত উত্তর আমেরিকার চিকিৎসকসহ অন্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের উদ্দেশ্য করেই এই ভার্চ্যুয়াল আলোচনা। ভাইরাসের ওপরে আমার সম্প্রতি লেখা ‘ম্যান ভার্সাস ভাইরাস’ বইটির সূত্র ধরে আমারও সেই প্যানেলে যোগ দেওয়ার সুযোগ হয়। ভেবেছিলাম, কীভাবে দেড়টি ঘণ্টা চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের জটিল ও নীরস দেহতত্ত্ব আলোচনায় কাটাব?
তবে দেখতে দেখতে নানা আলোচনায় দেড় ঘণ্টা চলে যায়। কোভিড-১৯ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অনেক প্রশ্ন। কিন্তু চিকিৎসকেরা কোভিড-১৯ এবং টিকা সম্পর্কে কি প্রশ্ন করতে পারেন? তা সাধারণ মানুষ থেকে নিশ্চয়ই কিছু ভিন্ন হবে। সেদিন তাঁদের মধ্যে বসেই সরাসরি জানতে পারলাম অনেক কিছু।
প্যানেল আলোচনায় ছিলেন ইবোলা টিকা গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ডা. রেজওয়ানুল ওয়াহিদ। ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসার ইনস্টিটিউটের সংক্রামক রোগ বিষয়ের প্রধান ডা. মশিউল চৌধুরী। দুজনই এখানে মেডিকেল কলেজের অধ্যাপনা করেন। আরও ছিলেন ফাইজারের টিকা গবেষণা বিভাগে কর্মরত ড. তৃষা দাশ গুপ্ত। উপস্থাপনায় ছিলেন ডা. হাফ্সা সিদ্দিকা ইমাম। ভেবেছিলাম, অ্যাসোসিয়েশনের কনফারেন্স বলে প্রথমে হয়তো সংগঠনের নেতাদের অনেক বক্তৃতা শুনতে হবে। তেমন কিছু হলো না। শুধু সংক্ষিপ্ত শুভেচ্ছা বক্তব্য দিলেন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. আজমল ইউসুফ।
সবাই টিকা নিয়ে তাঁদের মূল্যবান বক্তব্য এবং কাছ থেকে দেখা সব তথ্য দিলেন। প্রশ্ন-উত্তর শুরু হলো। যারা প্রশ্ন করছেন, তাঁরাও ডাক্তার। প্রশ্নোত্তরো এগিয়ে চলেছে আলোচনা। কাজেই সংক্ষেপে এই প্রশ্ন-উত্তরগুলোই তুলে ধরতে চাই এই লেখায়—
প্রশ্ন: ফাইজারের এম-আরএনএ টিকা কি আমাদের ডিএনএতে চলে যেতে পারে?
উত্তর: না। কোনোভাবেই না। কারণ এটি আমাদের কোষের নিউক্লিয়াসে কোনোভাবেই যাবে না, যেখানে আমাদের ডিএনএ/আরএনএ থাকে। এটি যাচ্ছে সাইটোসল। সেখান থেকে শরীর এটিকে বের করে দিচ্ছে। এই টিকা কোষের মধ্যে যে প্রোটিন তৈরি করে, লাইসোজম তাকে কিছু সময় পরে ভেঙে দিচ্ছে। কোষের কার্যক্রম যদি জানা থেকে, তাহলে বোঝা যাবে, যেকোনোভাবেই এই এম-আরএনএ টিকা মানুষের ‘জেনেটিক মেটেরিয়ালে’ যুক্ত হতে পারে না।
প্রশ্ন: এই টিকায় কি থ্যারাপিউটিক কোনো সুবিধা হবে?
উত্তর: এই টিকায় থ্যারাপিউটিক কোনো বিশেষ সুবিধা হবে বলে জানা নেই। অর্থাৎ যে রোগী ইতিমধ্যেই আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁকে টিকা দিলে ওষুধের মতো কোনো উপকার নাও হতে পারে, তবে দিলে কোনো অসুবিধাও নেই।
প্রশ্ন: ফাইজারের এই টিকা যখন আমাদের কাছে আসবে (প্রাইমারি ফিজিশিয়ান), তখন আমরা কীভাবে সংরক্ষণ করব? এর সংরক্ষণে অনেক নিম্ন তাপমাত্রার রেফ্রিজারেটর দরকার।
উত্তর: এটা প্রথমেই ডাক্তারদের অফিসে-অফিসে যাবে না। হাসপাতাল, যেখানে ফ্রিজিংয়ের সুবিধা আছে সিডিসি ও স্টেট সেখানে সেটাকে রাখবে। সেখান থেকে ডাক্তার ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সেবাকর্মীকে নিতে হবে।
প্রশ্ন: কেউ যদি দ্বিতীয় শট (বুস্টার শট) সময়মতো না নিতে পারে, তখন তার কি করণীয়?
উত্তর: অনেক ক্ষেত্রে বুস্টার শট না নিতে পারলে আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হয়। সেটাও আবার নির্ভর করবে বুস্টার শট নেওয়ার নির্ধারিত সময় কয়দিন পার হয়ে গেছে, তার ওপর। তবে এ বিষয়ে সিডিসির সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন শিগগিরই চলে আসবে, আশা করা যায়।
প্রশ্ন: এই টিকা শরীরের ইউনিটি কত দিন বজায় রাখবে?
উত্তর: এই পরীক্ষা শেষ হয়নি। ফেজ-৩ স্টাডি ছয় মাসও হয়নি, আরও দুবছর বা বেশি সময় ধরে চলবে। কাজেই, এই টিকায় অ্যান্টিবডি দীর্ঘদিন থাকবে কি না, তা দেখার বিষয়। বিশেষজ্ঞরা প্রাথমিক উপাত্ত থেকে বলছেন, ছয় মাস/এক বছর থাকতে পারে।
প্রশ্ন: যার একবার কোভিড-১৯ হয়ে গিয়েছে, তাঁর কি টিকা নেওয়ার প্রয়োজন আছে?
উত্তর: হ্যাঁ। কারণ অসুখটি যে অ্যান্টিবডি অর্থাৎ ইমিউনিটি তৈরি করছে, টিকা তার থেকে আরও শক্তিশালী ইমিউনিটি তৈরি করার কথা। এ বিষয়ে সিডিসি কোনো নির্দেশনা নিশ্চয়ই দেবে।
প্রশ্ন: এই টিকা কি ফ্লু টিকার মতো প্রতি বছর নিতে হবে?
উত্তর: সেরকম হওয়ার সম্ভাবনাও নাকচ করে দেওয়া যায় না। হয়তো প্রতিবছর বুস্টার শট নিতে হতে পারে। তবে এ বিষয়ে সিডিসির নির্দেশনার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
প্রশ্ন: এই টিকা কি অন্তঃসত্ত্বা নারীদের দেওয়া ঠিক হবে?
উত্তর: টিকা ট্রায়ালের সময় অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। জানুয়ারি থেকে ফাইজার অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অন্তর্ভুক্ত করবে বলে জানা গেছে। কাজেই সেই স্টাডি না হাওয়া পর্যন্ত না দেওয়াই উচিত হবে।
প্রশ্ন: রোগীকে একই সঙ্গে ফ্লু টিকা এবং কোভিড-১৯ টিকা বা অন্য আর কোনো টিকা দেওয়া যাবে?
উত্তর: এতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আমরা একসঙ্গে পাঁচটি বিভিন্ন টিকা পর্যন্ত দিয়ে থাকি। তবে সিডিসি কি নির্দেশনা দেয়, সেটা দেখার বিষয়। খুব সম্ভবত আগামী সপ্তাহে সেই নির্দেশনা পাওয়া যাবে।
প্রশ্ন: টিকা গ্রহীতা কি রোগটি ছড়াতে পারে?
উত্তর: সে সম্ভাবনা থেকেই যায়। টিকা নেওয়ার পর তার নিজের হয়তো রোগটি ‘সিম্পটোমাটিক’ আকারে হবে না। কিন্তু সে রোগটির ‘ক্যারিয়ার’ হতে পারে। সে জন্য টিকা নেওয়ার পরও মাস্ক পরা ও হাত স্যানিটাইজড করা ইত্যাদি চালিয়ে যেতে হবে।
এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের সব টিকাই যে ভালো, যেমন এম-আরএনএ টিকা বনাম লাইভ ভেক্টর টিকা টেকনোলজি (সনাতন প্রযুক্তির টিকা), এসব সম্পর্কে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা হয়। সবচেয়ে জোরেশোরে যে কথাটি হয়, তা হলো টিকাটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। ভয়ের কিচ্ছু নেই। বিশেষজ্ঞরা সবাই প্রথম সুযোগে টিকাটি নিতে প্রস্তুত। সবাইকে টিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, সেটাই একবাক্যে তাঁরা বললেন।
এভাবেই শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ অ্যালামনাই আয়োজিত টিকা সংক্রান্ত প্যানেল আলোচনা নিউইয়র্ক সময় রাত সাড়ে আটটা থেকে দশটা পর্যন্ত চলে।
ভেবেছিলাম চিকিৎসকদের ভিড়ে খেই হারিয়ে ফেলব। না, মনে হচ্ছে এই নভেল করোনাভাইরাস মহামারি আমাদের সবাইকে চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে আগ্রহী করে তুলছে।
কেউ হয়তো এখনো ভাবছেন, আমি সেখানে গিয়ে কি করলাম? আপনার মনের কাঁটা নিরসনের জন্যই বলছি, সাম্প্রতিক ভাইরাসের সংক্রমণ কেন বেড়ে চলছে, সে বিষয়টি নিয়ে আমি দু/চারটি কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম। নভেল করোনাভাইরাস একটি জুনোটিক ভাইরাস। গত ৫০ বছরে জুনোটিক ভাইরাসের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। এইচআইভি, ইবোলা, সার্স, মার্স, সোয়াইন ফ্লু, সর্বশেষ নভেল করোনাভাইরাস—এরা প্রায় সবই জুনোটিক ভাইরাস।
এই ভাইরাসের কারণ হলো, মানুষ বনভূমি উজাড় করছে, পরিবেশ দূষণ করছে, যার ফলে বনের প্রাণীরা তাদের আশ্রয় হারিয়ে ফেলছে। সে কারণেই বন্য প্রাণীর শরীরের ভাইরাস ক্রমেই বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষকে আক্রমণ শুরু করছে। এই জুনোটিক ভাইরাসের মহামারি কোভিড-১৯ এখানেই শেষ নয়। মানুষ সাবধান না হলে, পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে না আনলে, ভয়ংকর কোনো ভাইরাস আবারও আক্রমণ করে বসবে।
আরেকটি কথা, সবাই প্রথম সুযোগেই টিকা নিন। কোনো গুজবে কান দেবেন না। টিকা না নিলে শুধু যে রোগটি আপনার হতে পারে তা নয়। আপনি অন্যদের কাছে এই রোগটি ছড়াতে পারেন। নিজের স্বাস্থ্যের ওপরে না হয় আপনি ঝুঁকি নিতে পারেন, কিন্তু অন্যের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয় দাঁড়াবেন কেন?
Source:
https://northamerica.prothomalo.com/opinion/%E0%A6%9F%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%85%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%A1%E0%A6%BF-%E0%A6%A5%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87-%E0%A6%8F%E0%A6%95-%E0%A6%AC%E0%A6%9B%E0%A6%B0